অনেকেই নামাজ আদায় করে না। কিন্তু রমজান মাস আসলে ঠিকই রোজা পালন করে থাকে। এখন প্রশ্ন হলো যারা নামাজ না পড়ে শুধু রোজা পালন করে, তাদের রোজা কবুল হবে কিন।
চলুন বুখারী শরীফ এবং মুসলীম শরীফের আলোকে জেনে নিই।
বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন:
( ﻣَﻦْ ﺗَﺮَﻙَ ﺻَﻼﺓَ ﺍﻟْﻌَﺼْﺮِ ﻓَﻘَﺪْ ﺣَﺒِﻂَ ﻋَﻤَﻠُﻪُ )
“যে ব্যক্তি আসরের নামাজ ত্যাগ করে তার আমল নিষ্ফল হয়ে যায়। ” [ বুখারী – ৫২০ ]
“তার আমল নিষ্ফল হয়ে যায়” এর অর্থ হল: তা বাতিল হয়ে যায় এবং তা তার কোনো কাজে আসবে না। এ হাদিস প্রমাণ করে যে, বেনামাজির কোনো আমল আল্লাহ কবুল করেন না এবং বেনামাজি তার আমল দ্বারা কোন ভাবে উপকৃত হবে না। তার কোনো আমল আল্লাহর কাছে উত্তোলন করা হবে না।
ইবনুল কায়্যিম তাঁর ‘আস-স্বালাত’ নামক গ্রন্থের ৬৫ পৃষ্ঠায় এ হাদিসের মর্মার্থ আলোচনা করতে গিয়ে বলেন–
বেনামাজি ব্যক্তি দুই ধরণের-
(১) পুরোপুরিভাবে ত্যাগ করা। কোন নামাজই না-পড়া। এ ব্যক্তির সমস্ত আমল বিফলে যাবে।
(২) বিশেষ কোন দিন বিশেষ কোন নামাজ ত্যাগ করা। এক্ষেত্রে তার বিশেষ দিনের আমল বিফলে যাবে। অর্থাৎ সার্বিকভাবে সালাত ত্যাগ করলে তার সার্বিক আমল বিফলে যাবে। আর বিশেষ নামাজ ত্যাগ করলে বিশেষ আমল বিফলে যাবে। ” ।
“ফাতাওয়াস সিয়াম” (পৃ-৮৭) গ্রন্থে এসেছে শাইখ ইবনে উছাইমীনকে বেনামাযীর রোজা রাখার হুকুম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো তিনি উত্তরে বলেন:
“বেনামাযীর রোজা শুদ্ধ নয় এবং তা কবুলযোগ্য নয়। কারণ নামায ত্যাগকারী কাফের, মুরতাদ। ”
এর সপক্ষে দলিল হচ্ছে-
আল্লাহ্ তাআলার বাণী:
[ ﻓَﺈِﻥْ ﺗَﺎﺑُﻮﺍ ﻭَﺃَﻗَﺎﻣُﻮﺍ ﺍﻟﺼَّﻼﺓَ ﻭَﺁﺗَﻮُﺍ ﺍﻟﺰَّﻛَﺎﺓَ ﻓَﺈِﺧْﻮَﺍﻧُﻜُﻢْ ﻓِﻲ ﺍﻟﺪِّﻳﻦِ ][ ﺍﻟﺘﻮﺑﺔ : 11 ]
“আর যদি তারা তওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই। ” [ সূরা তওবা: ১১]
নবী ﷺ এর বাণী:
( ﺑَﻴْﻦَ ﺍﻟﺮَّﺟُﻞِ ﻭَﺑَﻴْﻦَ ﺍﻟﺸِّﺮْﻙِ ﻭَﺍﻟْﻜُﻔْﺮِ ﺗَﺮْﻙُ ﺍﻟﺼَّﻼﺓِ ) ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ ( 82 )
“কোন ব্যক্তির মাঝে এবং শির্ক ও কুফরের মাঝে সংযোগ হচ্ছে সালাত বর্জন। ”[ সহিহ মুসলিম ৮২]
এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাণী –
( ﺍﻟْﻌَﻬْﺪُ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﺑَﻴْﻨَﻬُﻢْ ﺍﻟﺼَّﻼﺓُ ﻓَﻤَﻦْ ﺗَﺮَﻛَﻬَﺎ ﻓَﻘَﺪْ ﻛَﻔَﺮَ ) ( ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻱ ( 2621 ) . ﺻﺤﺤﻪ ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻲ ﻓﻲ ﺻﺤﻴﺢ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻱ )
“আমাদের ও তাদের মধ্যে চুক্তি হলো নামাযের। সুতরাং যে ব্যক্তি নামায ত্যাগ করল, সে কুফরি করল। ” [
জামে তিরমিযী (২৬২১), আলবানী ‘সহীহ আত-তিরমিযী’ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলে চিহ্নিত করেছেন]
এই মতের পক্ষে সাহাবায়ে কেরামের ‘ইজমা’ সংঘটিত না হলেও সর্বস্তরের সাহাবীগণ এই অভিমত পোষণ করতেন।
প্রসিদ্ধ তাবেয়ী আব্দুল্লাহ ইবনে শাক্বিক রাহিমাহুমুল্লাহ বলেছেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবীগণ নামায ছাড়া অন্য কোন আমল ত্যাগ করাকে কুফরি মনে করতেন না। ”
পূর্বোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, যদি কোন ব্যক্তি রোজা রাখে; কিন্তু নামায না পড়ে তবে তার রোজা প্রত্যাখ্যাত, গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা কেয়ামতের দিন আল্লাহ্র কাছে কোন উপকারে আসবে না। আমরা এমন ব্যক্তিকে বলবো: আগে নামায ধরুন, তারপর রোজা রাখুন। আপনি যদি নামায না পড়েন, কিন্তু রোজা রাখেন তবে আপনার রোজা প্রত্যাখ্যাত হবে; কারণ কাফেরের কোন ইবাদত কবুল হয় না। ”
গোসল ফরয হলে কি অবশ্যই গোসল করে সেহরী খেতে হবে, নাকি পরে গোসল করলেও চলবে? সেহেরী খেয়ে ঘুমানোর পর স্বপ্নদোষ হলে রোযা কি ভেঙ্গে যায় অথবা মাকরূহ হয়?
উত্তর : যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর। দুরুদ ও সালাম আল্লাহর রাসূল (সা) এর উপর। পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। সেহেরী খেয়ে ঘুমানোর পর স্বপ্নদোষ হলে রোযা ভেঙে যায় না, রোজার কোনই ক্ষতি হয় না।
আর, গোসল ফরয হলে গোসল করে সাহরি খাওয়া উত্তম, তবে সময় যদি কম থাকে তবে সাহরি খেয়ে নিয়ে পরে গোসল করলেও কোন সমস্যা নাই। আশা করি উত্তর পেয়েছেন আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।
রমজান মাসে যারা অসুস্থ বা পীড়িত, অতিশয় বৃদ্ধ, যাদের দৈহিক ভীষণ দুর্বলতার কারণে রোজা পালন করা খুবই কষ্টদায়ক হয় এবং যারা ভ্রমণে থাকার কারণে সিয়াম পালন করতে পারে না, তাদের জন্য রোজার কাজা, কাফফারা ও ফিদ্ইয়া ইত্যাদি ব্যবস্থা স্থির করে ইসলামি শরিয়তে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান রয়েছে।
এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য তোমাদের মধ্যে কেউ পীড়িত হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। এটা (সিয়াম) যাদের অতিশয় কষ্ট দেয়, তাদের কর্তব্য এর পরিবর্তে ‘ফিদ্ইয়া’ অর্থাৎ একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করা। যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎ কাজ করে, তবে তা তার পক্ষে অধিক কল্যাণকর। ‘যদি তোমরা উপলব্ধি করতে তবে বুঝতে সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণপ্রসূ।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৪)
যেসব কারণে রমজান মাসে রোজা ভঙ্গ করা যাবে কিন্তু পরে কাজা করতে হয় তা হচ্ছে;
১. মুসাফির অবস্থায়।
২. রোগ-ব্যাধি বৃদ্ধির বেশি আশঙ্কা থাকলে।
৩. মাতৃগর্ভে সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে।
৪. এমন ক্ষুধা বা তৃষ্ণা হয়, যাতে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকতে পারে।
৫. শক্তিহীন বৃদ্ধ হলে।
৬. কোনো রোজাদারকে সাপে দংশন করলে।
৭. মহিলাদের মাসিক হায়েজ-নেফাসকালীন রোজা ভঙ্গ করা যায়।
যেসব কারণে শুধু কাজা আদায় করতে হয় (অর্থাৎ একটির পরিবর্তে একটি):
১. স্ত্রীকে চুম্বন বা স্পর্শ করার কারণে যদি বীর্যপাত হয়।
২. ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে।
৩. পাথরের কণা, লোহার টুকরা, ফলের বিচি গিলে ফেললে।
৪. ডুশ গ্রহণ করলে।
৫. নাকে বা কানে ওষুধ দিলে (যদি তা পেটে পৌঁছে)।
৬. মাথার ক্ষতস্থানে ওষুধ দেওয়ার পর যদি তা মস্তিষ্কে বা পেটে পৌঁছে।
৭. যোনিপথ ব্যতীত অন্য কোনোভাবে সহবাস করার ফলে বীর্য নির্গত হলে।
৮. স্ত্রী লোকের যোনিপথে ওষুধ দিলে।
উল্লেখ্য, রমজান মাস ছাড়া অন্য সময়ে রোজা ভঙ্গের কোনো কাফফারা নেই, শুধু কাজা আছে।
যেসব কারণে কাজা ও কাফফারা উভয়ই আদায় করতে হয় (অর্থাৎ একটির পরিবর্তে ১+৬০= ৬১টি রোজা রাখতে হবে):
১. রোজা অবস্থায় ইচ্ছাকৃত পানাহার করলে।
২. রোজা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস করলে।
কাফফারা আদায়ের উপায়-
কাফফারা তিন উপায়ে আদায় করা যায়। প্রথমত, একটি গোলাম আজাদ করা বা দাসমুক্ত করা; দ্বিতীয়ত, বিরতিহীনভাবে ৬০টি রোজা পালন করা।
কাফফারার রোজার মাঝে বিরতি হলে বা ভাঙলে আরেকটি কাফফারা ওয়াজিব হয়ে যাবে। তৃতীয় হলো ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা ভালোভাবে আহার করানো বা আপ্যায়ন করা।
রোজার ফিদ্ইয়া:
কারও পক্ষে রোজা রাখা দুঃসাধ্য হলে একটা রোজার পরিবর্তে একজন দরিদ্রকে অন্নদান করা কর্তব্য। শরিয়ত মোতাবেক রোজা পালনে অক্ষম বা সামর্থ্যহীন হলে প্রতিটি রোজার জন্য একটি করে ‘সাদাকাতুল ফিতর’-এর সমপরিমাণ গম বা তার মূল্য গরিবদের দান করাই হলো রোজার ‘ফিদ্ইয়া’ তথা বিনিময় বা মুক্তিপণ। অতিশয় বৃদ্ধ বা গুরুতর রোগাক্রান্ত ব্যক্তি, যার সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই অথবা রোজা রাখলে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে, তারা রোজার বদলে ফিদ্ইয়া আদায় করবে। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তি যদি সুস্থ হয়ে রোজা রাখার মতো শক্তি ও সাহস পায়, তাহলে তার আগের রোজার কাজা আদায় করতে হবে। তখন আগে আদায়কৃত ফিদ্ইয়া সাদকা হিসেবে গণ্য হবে।
অসুস্থ ব্যক্তি ফিদ্ইয়া বা মুক্তিপণ আদায় না করে মারা গেলে তার পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে ফিদ্ইয়া আদায় করা কর্তব্য; যদি মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করে যায়। অন্যথায় আদায় করা মুস্তাহাব।
উল্লেখ্য, প্রতিটি রোজার ফিদ্ইয়া হলো একটি সাদাকাতুল ফিতর দরিদ্র এতিম বা মিসকিনকে দান করা অথবা একজন ফকির বা গরিবকে দুই বেলা পেট পুরে খাওয়ানো। অনেক জায়গায় দেখা যায় গরিব লোক কোনো ধনীর বদলি রোজা পালন করে দিচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই একজনের রোজা অন্যজন বদলি হিসেবে পালন করতে পারবে না।
কেউ কারও রোজা বদলি হিসেবে রাখলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা শুদ্ধ হবে না।
রোজার ফিদ্ইয়া গুনাহমাফির মাধ্যমে মানুষকে নিষ্কলুষ ও নির্ভেজাল করে। বিনা কারণে যে ব্যক্তি একটি রোজা না রাখে এবং পরে যদি ওই রোজার পরিবর্তে সারা বছরও রোজা রাখে, তবু সে ততটুকু সওয়াব পাবে না, যতটুকু মাহে রমজানে ওই একটি রোজা পালনের কারণে পেত। এ সম্পর্কে ফিকহবিদদের মতে, দুই মাস একাধারে রোজা রাখলে স্বেচ্ছায় ভাঙা একটি রোজার কাফফারা আদায় হয়। এ কাফফারার বিনিময়ে একটি রোজার ফরজের দায়িত্বটাই কেবল আদায় হয়।
আর যারা নানা অজুহাতে ও স্বেচ্ছায় পুরো মাহে রমজানের রোজা রাখে না, তাদের শাস্তি কত যে কঠিন হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গকারীদের ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাহে রমজানের এক দিনে রোজা কোনো ওজর বা অসুস্থতা ব্যতীত ভঙ্গ করবে, সারা জীবনের রোজাও এর ক্ষতিপূরণ হবে না, যদি সে সারা জীবনও রোজা রাখে।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদ)
ইচ্ছাকৃত রোজা না রাখলে যে কঠিন শাস্তির হুকুম এসেছে, সেই ব্যক্তি ইহকালে তা না পেলেও পরকালে জাহান্নামের দাউ দাউ অগ্নিকুণ্ডে তার শাস্তি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ; তাই রমজান মাসে রোজার সংখ্যা পূরণ করাই অধিকতর শ্রেয় ও কল্যাণকর।
জাহান্নামের আগুন প্রতিরোধের ঢাল হচ্ছে রোজা। হাদিসের ভাষ্যমতে রোজা মুমিনের ঢাল। শয়তানের কুমন্ত্রণা প্রতিহত এবং নিজের নফসকে দমন করার জন্য পবিত্র রমজান মাসের সিয়াম সাধনা অন্যতম। রোজার মাধ্যমে নফস দমিত হয়। শয়তান হয় পরাভূত।
শয়তানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত মুমিনের ঢাল রোজা। এই ঢাল যেন অক্ষুন্ন থাকে ইসলামিক স্কলাররা সে নিমিত্ত ছয়টি গুণের কথা বলেছেন। রোজাদাররা এই গুণগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারলে তার রোজা হবে নির্মল, নিষ্কলুষ। তা দ্বারা শয়তানের চক্রান্তকে নিমিষেই প্রতিহত করা সম্ভব হবে।
পবিত্র কোরআনে শয়তানকে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কারণ সে প্রতিনিয়ত গভীর সব যড়ষন্ত্রের মাধ্যমে মানুষকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিতে বদ্ধপরিকর।
শয়তানকে পরাভূত করে জান্নাতের দিকে এগিয়ে যেতে শয়তানের সঙ্গে মানুষের লড়াই একটি সাধারণ ব্যাপার। এতে কেউ হারে, কেউ জিতে যায়।
১/ নজরের হেফাজত বা চোখের যথাযথ ব্যবহার। অপাত্রে দৃষ্টিদান থেকে বিরত থাকা এর মূল উদ্দেশ্যে। হাদিসের ভাষ্যমতে, বদনজর শয়তানের একটি বিষাক্ত তীর। তা দিয়ে সে মানুষকে ঘায়েল করে। নজরের হেফাজত করলে ঈমানের স্বাদ লাভ করা যায়।
হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘অন্য নারীর প্রতি কুদৃষ্টি ইবলিশের বিষাক্ত তীরতুল্য। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে তা ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তার অন্তরে ঈমানের মিষ্টতা দান করেন।’ -ইতিলাকুল কুলুব: ২৭৩
২/ জবানের হেফাজত। নিজের মুখ দিয়ে অন্য কাউকে কোনো ধরনের কষ্ট না দেওয়া অন্যতম মহৎ গুণ। অন্য কাউকে গালি দেওয়া, অশ্লীল কথা বলা, পরনিন্দা বা গীবত করা সবই এর অন্তর্ভুক্ত। এমনকি মুখ ভেংচি কেটে কারও মনে আঘাত করাও এর আওতাধীন। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যার হাত এবং জবানের অনিষ্ট থেকে মুসলিম মুক্ত থাকে সেই প্রকৃত মুসলিম।’ -মুসনাদে আহমাদ: ৬৫১৫
৩/ কানের হেফাজত। ইচ্ছাপূর্বক নিষিদ্ধ শব্দতরঙ্গ শ্রবণ থেকে নিজের কানকে পবিত্র রাখা এর উদ্দেশ্য। গীবত কিংবা পরনিন্দাও এর আওতাভুক্ত। পরনিন্দা করা যেমন গোনাহ, ঠিক তেমনি তা শোনাও পাপ। সূরা মায়িদার বেয়াল্লিশ নম্বর আয়াতে মিথ্যা কথা শোনার অসারতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৪/ উল্লিখিত অঙ্গগুলোসহ শরীরের অন্যসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর হেফাজত করা। শরীরের যাবতীয় অঙ্গগুলোকে মহান আল্লাহর নির্দেশনা মোতাবেক পরিচালনা করা এবং যাবতীয় নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার অনুশীলন করা। একটি মাস যদি এই অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে আশা করা যায় যে; বাকি এগারো মাসও এই ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।
৫/ অতি ভোজন পরিহার করা। নফসকে দমন করার জন্য রোজা অন্যতম হাতিয়ার। শুধু রোজা কেন বছরের কোনো সময়ই অতি ভোজন কল্যাণকর নয়। শরীরের জন্যও নয়, আত্মার জন্যও নয়। পরিমিত আহার সুস্থতার চাকিকাঠি। প্রয়োজনীয় আহারের বাইরে যা কিছু হয় তাই অপব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত। আর স্বভাবতই অপচয় একটি বর্জনীয় কর্ম। পবিত্র কোরআনে অপব্যয়কারীকে শয়তানের সহোদর আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
৬/ রোজা কবুল হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে অন্তরে ভয় জাগ্রত রেখে আল্লাহর রহমতের কামনা করা। কোনো মানুষ শুধু নিজের আমলের দ্বারা জান্নাতের উপযুক্ত হতে পারে না। এ জন্য চাই মহান রবের অপার দয়া-অনুগ্রহ। আবার শুধু তার দয়ার আশায় আমল বন্ধ করে দিলেও তার নির্দেশ অমান্য হয়। কারণ তিনি আমলের নির্দেশ প্রদান করেছেন। তাই আমল করার সঙ্গে সঙ্গে তার রহমতের আশা করে যেতে হবে।
প্রশ্ন : কী কী কারণে রোজা ভঙ্গ হয়?
উত্তর : রোজা ভঙ্গের অনেক কারণ রয়েছে। রোজা নিয়ে যেসব বই রয়েছে বা সিয়ামের আহকাম-সংশ্লিষ্ট যে বইগুলো রয়েছে, সেগুলো থেকে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। তারপরও রোজা ভঙ্গের মৌলিক বিষয়গুলো আমরা বলতে পারি।
সিয়াম ভঙ্গের জন্য প্রথমত যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো—স্ত্রী সহবাস অথবা স্বেচ্ছায় যেকোনো ধরনের যৌনকাজে সম্পৃক্ত হওয়া। এটি সিয়াম নষ্ট করে দেয়। তাই কেউ যদি স্বেচ্ছায় কোনো যৌন চাহিদা পূরণ করার জন্য চেষ্টা করেন, সেটা স্ত্রী সহবাস অথবা যেকোনোভাবে হোক না কেন, তাহলে তার সিয়াম নষ্ট হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে পানাহার করা। স্বেচ্ছায় যদি কোনো ব্যক্তি পানাহার করেন, তাহলে তার সিয়াম নষ্ট হয়ে যাবে।
তৃতীয় বিষয়টি একটু দীর্ঘ আলোচ্য বিষয়। সেটা হচ্ছে পানাহারের অর্থ যেখানে পাওয়া যায়, অর্থাৎ যে কাজের মধ্যে পানাহারের অর্থ পাওয়া যায়, সে কাজগুলোও সিয়ামকে নষ্ট করে। যেমন আপনি যদি ধূমপান করেন, তাহলে আপনার সিয়াম নষ্ট হবে। অথবা আপনি কিছু গিলে ফেললেন, যেমন—পাথর বা এই জাতীয় কিছু আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেললে সিয়াম নষ্ট হবে। তবে যদি থুতু গিলে থাকেন, তাহলে সিয়াম নষ্ট হবে না, কারণ থুতু পানাহারের মতো বিষয় নয়। এটা শরীরের অভ্যন্তরীণ একটা বিষয়।
আর পানাহারের অর্থ নেই যে বিষয়গুলোতে সেগুলো সিয়াম নষ্ট করে না, যেমন—চোখে ড্রপ দিলে, কানে ড্রপ দিলে, ইনসুলিন নিলে, ইনজেকশন নিলে সিয়াম নষ্ট হবে না। কিন্তু পানাহারের অর্থ পাওয়া যায় এমন ইনজেকশন বা স্যালাইন নিলে, যেগুলো খাদ্যের কাজ করে, শক্তিবর্ধক অথবা খাদ্যের ব্যবস্থা আছে, সেই স্যালাইন যদি কেউ নিয়ে থাকেন, তাহলে তার সিয়াম নষ্ট হয়ে যাবে।
তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, সিয়াম ভঙ্গের মৌলিক বিষয় হচ্ছে তিনটি। প্রথমত, স্ত্রী সহবাসসহ যেকোনো ধরনের যৌনাচার। দ্বিতীয়ত, পানাহার বা খাদ্য গ্রহণ করা। তৃতীয়ত, পানাহারের অর্থ যেগুলোর মধ্যে রয়েছে, সেগুলো সিয়াম নষ্ট করে থাকে।